যেকোনো সময় বড় মাত্রার আকস্মিক ধসের আশঙ্কা

কোম্পানির বাজারমূল্য ওঠানামার নতুন রেকর্ড ওয়াল স্ট্রিটে

দৈনিক শত শত বিলিয়ন ডলারের শেয়ারদর ওঠানামা ওয়াল স্ট্রিটে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

দৈনিক শত শত বিলিয়ন ডলারের শেয়ারদর ওঠানামা ওয়াল স্ট্রিটে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এ থেকে বাজারে নাজুক এক পরিস্থিতির ইঙ্গিত পাচ্ছেন বিশ্লেষকরা, যেখানে বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তারা বলছেন, মার্কিন শেয়ারবাজারে নিরবচ্ছিন্ন উত্থানে ভূমিকা রাখছে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো। এসব কোম্পানির মাঝে আর্থিক অস্থিরতা বাড়ছে দ্রুতগতিতে। এতে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছা পুঁজিবাজারে হুট করে বড় ধরনের ধস নামতে পারে যেকোনো সময়।

এফটির প্রতিবেদন অনুসারে চলতি বছরের এখন পর্যন্ত একক কোনো কোম্পানির বাজারমূল্য একদিনে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৃদ্ধি বা হ্রাস পেয়েছে ১১৯ বার। এর আগে কোনো বছরে এমনটা দেখা যায়নি। গত বছর এমন ঘটনা ঘটেছিল ৮৪ বার এবং ২০২২ সালে ৩৩ বার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শত বিলিয়ন ডলারের শেয়ারদর ওঠানামার আংশিক কারণ হলো এনভিডিয়া, মাইক্রোসফট ও অ্যাপলের মতো কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য। প্রত্যেকটি কোম্পানিরই বাজারমূল্য এখন ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। এর মধ্যে এনভিডিয়া এখন বিশ্বের প্রথম ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হওয়ার পথে। এ ধরনের কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে অল্প পরিবর্তনও ডলারের হিসাবে অনেক বড় অংকের হয়ে থাকে।

বাজারের সামগ্রিক চিত্র অনুযায়ী চলতি বছরের ওঠানামা অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছেছে। ব্যাংক অব আমেরিকা বলছে, ২০২৫ সালে শত বিলিয়ন ডলার ওঠানামা সংখ্যায় আগের বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বড় টেক কোম্পানির শেয়ারদর স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করে হঠাৎ তীব্রভাবে ওঠানামা করলে এ ঘটনাগুলো ঘটে।

ব্যাংকটির গ্লোবাল কোয়ান্ট ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজি বিভাগের প্রধান অভি দেব বলেন, ‘আমরা এখন বড় বাজারমূল্যের কোম্পানির শেয়ারদর দৈনিক ১০, ২০, এমনকি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ওঠানামা দেখতে পাচ্ছি, যা একসময় খুব বিরল ঘটনা ছিল।’

মার্কিন শেয়ারবাজারে শীর্ষ পাঁচ টেক কোম্পানি মেটা, অ্যালফাবেট, মাইক্রোসফট, অ্যাপল ও অ্যামাজনের সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ১৫ ট্রিলিয়ন বা ১৫ লাখ কোটি ডলার। শিগগিরই কোম্পানিগুলো তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। এ বিষয়ে সিজ গ্রুপের ট্রেডিং বিভাগের প্রধান ভ্যালেরি নোয়েল বলেন, ‘কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন বিনিয়োগকারীদের হতাশ করলে তাদের পতন বেশ বিপর্যয়কর হতে পারে।’

বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছে, বড় কোম্পানির শেয়ারদরে তীব্র ওঠানামা সত্ত্বেও সামগ্রিক বাজার অস্থিরতা এখনো তুলনামূলক কম। কারণ সাধারণত জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর একই সঙ্গে ওঠানামা করছে না। ফলে এপ্রিলের বড় পতনের পরও এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক নতুন নতুন রেকর্ড ছুঁয়ে যাচ্ছে।

অভি দেব বলেন, ‘তখনই সতর্ক হতে হবে, যখন বড় কোনো অর্থনৈতিক বা বাজারসংক্রান্ত ঘটনায় সব শেয়ার একসঙ্গে একই দিকে ওঠানামা করতে শুরু করে। তখন পুরো বাজারে অনেক বেশি অস্থিরতা দেখা দেবে।’

বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারদরের এ বিশাল দোলাচলের বড় উৎস ডেরিভেটিভ বাজার। কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন বা বড় অর্থনৈতিক ঘোষণার আগে স্বল্পমেয়াদে এ বাজারে নির্দিষ্ট শেয়ারের ওপর বিনিয়োগ করে খুচরা বিনিয়োগকারী ও হেজ ফান্ডগুলো। আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস বলছে, মার্কেট মেকারদের অবস্থান ঠিক রাখতে শেয়ারদরের ওঠানামা তখন তীব্র হয়ে ওঠে।

প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, একক শেয়ারভিত্তিক ও লিভারেজড এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডের (ইটিএফ) জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। এ ধরনের তহবিল প্রতিদিন কোনো নির্দিষ্ট শেয়ারের দ্বিগুণ বা তিন গুণ লাভ কিংবা ক্ষতির পূর্বাভাস দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের লিভারেজড পণ্যমূল্যের ওঠানামা বাজারের নাজুক পরিস্থিতিকে আরো তীব্র করে তোলে। কারণ ফান্ডগুলোর দৈনিক নির্দিষ্ট অনুপাত ধরে রাখতে হলে, দাম বাড়লে তাদের আরো শেয়ার কিনতে হয় এবং কমলে বিক্রি করতে হয়।

ভ্যালেরি নোয়েল বলেন, ‘১০০ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি মূল্যের এসব ওঠানামা এখন অনেক বেশি সাধারণ হয়ে গেছে। কারণ হলো কোয়ান্ট ট্রেডিং কৌশল, জিরো-ডে অপশন ও একক শেয়ারে দ্বিগুণ বা তিন গুণ লিভারেজড ইটিএফের উত্থান।’

তবে বাজারের এ তীব্র অস্থিরতা চলতি বছর সামগ্রিক সূচকে প্রতিফলিত হয়নি। যদিও অক্টোবরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে বাজার অস্থিরতা পরিমাপক সূচক ভিআইএক্স সাময়িকভাবে বেড়েছিল। তবু গত জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিক ছিল ২০১৮ সালের পর থেকে সবচেয়ে শান্ত প্রান্তিক।

গোল্ডম্যান স্যাকসের ডেরিভেটিভ গবেষণা বিভাগের প্রধান জন মার্শাল বলেন, ‘বর্তমান বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), করনীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধের মতো বিষয় কিছু শেয়ারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, আবার কিছু শেয়ারদর বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউবিএসের মতে, বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক খুবই নিম্নস্তরে নেমে এসেছে। এতে একটি কোম্পানির শেয়ারের দোলাচল অন্যটিকে খুব একটা প্রভাবিত করছে না।

তবে বিশ্লেষকদের সতর্কতা, যদি এ সম্পর্ক হঠাৎ বেড়ে যায় এবং বড় টেক স্টকগুলো একযোগে পতনের মুখে পড়ে, তাহলে বাজারের স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। ইউবিএসের ইউএস ইকুইটি ডেরিভেটিভস-প্রধান ম্যাক্সওয়েল গ্রিনাকফ বলেন, ‘এতে যেসব ট্রেডার দাম আরো বাড়বে ভেবে অবস্থান নিয়েছিলেন, তারা বাধ্য হয়ে হঠাৎ শেয়ার বিক্রি শুরু করবেন।’

জেপি মরগান বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিলের পর ১০ অক্টোবর ওয়াল স্ট্রিটে সবচেয়ে বড় একদিনের পতন ঘটে। তখন লিভারেজড ইটিএফগুলোকে নির্দিষ্ট লিভারেজ অনুপাত ঠিক রাখতে বাজার বন্ধের সময় ২৬ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার বিক্রি করতে হয়।

ম্যাক্সওয়েল গ্রিনাকফ সতর্ক করে বলেন, ‘যদি বাজারে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস এবং একযোগে উত্থান শুরু হয়, তাহলে কোনো অজানা আঘাতে সবকিছু একসঙ্গে উল্টো দিকে চলে যেতে পারে।’

আরও